
টেন্ডার ব্যবস্থাপনা, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও কথিত সম্পদের উৎস নিয়ে বিতর্ক; নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
নিজস্ব প্রতিবেদক:
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড মেকানিক্যাল (ই/এম) সার্কেল-৩-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহাবুবুল হক চৌধুরীকে ঘিরে সরকারি প্রকল্পের বিল অনুমোদন, টেন্ডার ব্যবস্থাপনা, ঠিকাদারি কার্যক্রম এবং কথিত সম্পদের উৎস নিয়ে একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। বিশেষ করে একটি সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে ১৭ কোটি ৮ লাখ ৮৩ হাজার ১৪৪ টাকার বিল অনুমোদনের বিষয়টি ঘিরে নানা প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি, সম্পন্ন কাজের পরিমাণ, সরঞ্জাম সরবরাহ এবং অনুমোদিত বিলের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ই/এম সার্কেল-৩-এর আওতাধীন বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে দরপত্র আহ্বান, মূল্যায়ন, কার্যাদেশ প্রদান, কাজের অগ্রগতি যাচাই, সরঞ্জাম সরবরাহ ও বিল পরিশোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধাপে একটি নির্দিষ্ট প্রভাববলয়ের ভূমিকা খতিয়ে দেখা দরকার। কিছু প্রকল্পে নির্দিষ্ট ঠিকাদার বা ঠিকাদারি গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা এবং দরপত্র মূল্যায়ন ও কার্যাদেশ প্রদানে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও তুলেছেন তাঁরা। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি। প্রকৃত চিত্র জানতে দরপত্রের নথি, মূল্যায়ন প্রতিবেদন, কার্যাদেশ, চুক্তিপত্র, কাজের পরিমাপ এবং বিল পরিশোধসংক্রান্ত কাগজপত্র পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
অভিযোগগুলোর মধ্যে আলোচনায় এসেছে ১৭ কোটি ৮ লাখ ৮৩ হাজার ১৪৪ টাকার বিল অনুমোদনের বিষয়টি। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, বিল অনুমোদনের আগে কাজের পরিমাণ, গুণগত মান, প্রকৌশলগত মূল্যায়ন, সরবরাহ করা সরঞ্জামের বিবরণ এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না। তাঁদের মতে, সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রতিটি ধাপে বিধিবিধান অনুসরণ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ বিলের ক্ষেত্রে অনিয়ম হয়েছে—এমন কোনো চূড়ান্ত সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন বা প্রমাণিত সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে মাহাবুবুল হক চৌধুরীর নামে বা তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে দাবি করা কয়েকটি স্থাবর সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট, পশ্চিম আগারগাঁও এলাকায় একটি চারতলা ভবন এবং বনশ্রী-আমুলিয়া এলাকায় জমিসহ আরও কিছু সম্পদের বিষয়ে যাচাই প্রয়োজন। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, ক্রয়মূল্য ও অর্থের উৎস কী এবং সম্পদ অর্জনের ব্যয় বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না। তবে উল্লিখিত সম্পদগুলোর মালিকানা, মূল্য কিংবা অর্থের উৎস সম্পর্কে কোনো চূড়ান্ত সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নির্ভরযোগ্য নথি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই অপরিহার্য।
জানা গেছে, ঠিকাদার আলাউদ্দিন ওয়াজেদ এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন, বিল অনুমোদন, সরঞ্জাম ক্রয়, অর্থ পরিশোধ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অভিযোগ জমা পড়া মানেই অনিয়ম প্রমাণিত হওয়া নয়। এ বিষয়ে দুদকের চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন, আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত কিংবা অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করে এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কেও কমিশনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এ প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, বিভিন্ন প্রশাসনিক পরিবর্তনের পরও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ঘিরে একটি প্রভাববলয় সক্রিয় রয়েছে। অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন তোলা, তথ্য সংগ্রহ কিংবা সংবাদ প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে চাপ প্রয়োগের চেষ্টার অভিযোগও করেছেন তাঁরা। তবে এসব দাবির স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগগুলোর প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণে দাপ্তরিক নথি, প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পর্যালোচনা করা জরুরি। সরকারি প্রকল্পে জনগণের অর্থ ব্যয় হওয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কোনো অভিযোগের তদন্ত হওয়া উচিত নিরপেক্ষভাবে এবং প্রমাণের ভিত্তিতে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহাবুবুল হক চৌধুরীর বক্তব্য জানতে তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। ফলে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় তাঁর বক্তব্য অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, ১৭ কোটি ৮ লাখ ৮৩ হাজার ১৪৪ টাকার বিল অনুমোদন, টেন্ডার ব্যবস্থাপনা, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং কথিত সম্পদের উৎস নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ যাচাই প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে প্রকল্পের নথিপত্র, বিল-ভাউচার, কাজের পরিমাপ, দরপত্র মূল্যায়ন, সম্পদসংক্রান্ত দলিল এবং অর্থের উৎস পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অবস্থান স্পষ্ট করাও জরুরি। এতে সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার, প্রশাসনিক জবাবদিহি ও জনআস্থা নিশ্চিত করার পথ আরও সুগম হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 










