০৬:৫৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬, ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

শিক্ষায় বৈষম্য: উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় – মোহাম্মদ মঈনুল আলম ছোটন

বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে আজ সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে বৈষম্য। সরকারি ও বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ফি, কোর্স ফি এবং শিক্ষা সামগ্রীর দাম এতটাই অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে যে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের জন্য শিক্ষার পথ ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। অথচ একটি জাতির উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগে শিক্ষায় সর্বোচ্চ ভর্তুকি দেওয়া। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত শিক্ষায় কিছু ভর্তুকি দেওয়া হলেও তা দেশের বাস্তব চাহিদার তুলনায় খুবই অপ্রতুল।

শিক্ষায় প্রবেশাধিকার সংকট :
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) ২০২৪ সালের তথ্যমতে, প্রাথমিক সমাপনীর পর মাধ্যমিকে ভর্তি হওয়ার হার শহরে প্রায় ৯০%, অথচ গ্রামে তা ৬২% এরও কম। দরিদ্র পরিবারের বহু শিশু প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেই ঝরে পড়ে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্বাভাবিক কোর্স ফি’র চাপে উচ্চশিক্ষার পথে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গড় বার্ষিক খরচ প্রায় ১২,০০০ টাকা, কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে একই কোর্সের খরচ ১,২০,০০০ থেকে ৩,৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত। এর ফলে উচ্চশিক্ষায় সুযোগ প্রায় একচেটিয়াভাবে উচ্চবিত্তের হাতে চলে যাচ্ছে।

উচ্চশিক্ষায় বৈষম্য :
বিদেশে পড়াশোনার সুযোগও প্রায় পুরোপুরি উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা সামাজিক বৈষম্যকে আরও গভীর করছে।

কারিগরি শিক্ষার অভাব :
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখনও মূলত বইভিত্তিক জ্ঞানকেন্দ্রিক। অথচ চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় কারিগরি দক্ষতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। ভারত Skill India Mission-এর মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে বিদেশে রপ্তানি করছে। বিপরীতে, বাংলাদেশের প্রায় ৭০% প্রবাসী শ্রমিক অদক্ষ। ফলে তারা বিদেশে অধিকাংশ সময় লেবার হিসেবে কাজ করে, যেখানে ভারতের দক্ষ কর্মীরা ইঞ্জিনিয়ারিং, মোটর মেকানিক্স, টেকনিশিয়ানসহ উচ্চ আয়ের পেশায় যুক্ত হচ্ছে।

সমাধানের প্রস্তাব :
শিক্ষায় সর্বোচ্চ ভর্তুকি দিতে হবে, অর্থাৎ জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির অন্তত ৬% করতে হবে।
দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থীদের জন্য বই, খাতা, ইউনিফর্ম ও ডিজিটাল ডিভাইস বিনামূল্যে প্রদান করতে হবে। কারিগরি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন্তত একটি কারিগরি কোর্স চালু ও বাধ্যতামূলক করতে হবে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন সংখ্যা বৃদ্ধি করে অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থীকে কম খরচে উচ্চশিক্ষার সুযোগ দিতে হবে। উপজেলা পর্যায়ে স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার করে প্রযুক্তি, শিল্প ও সেবা খাতে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। নিম্ম ও মধ্যভিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষার জন্য সুদমুক্ত বা সহজলভ্য শিক্ষা ঋণের ব্যবস্হা করতে হবে।

উপসংহার :
শিক্ষা কোনো ব্যয় নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। শিক্ষায় বৈষম্য দূর না হলে একটি জাতি তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারবে না। বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষায় জোর দিয়ে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা গেলে শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাবে। দক্ষ জনশক্তিই হতে পারে টেকসই উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি।

মোঃ মঈনুল আলম ছোটন
আহ্বায়ক, শহীদ জিয়া স্মৃতি সংসদ,
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা।

শিক্ষায় বৈষম্য: উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় – মোহাম্মদ মঈনুল আলম ছোটন

সময় : ০৫:১৮:৪৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১০ অগাস্ট ২০২৫

বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে আজ সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে বৈষম্য। সরকারি ও বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ফি, কোর্স ফি এবং শিক্ষা সামগ্রীর দাম এতটাই অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে যে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের জন্য শিক্ষার পথ ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। অথচ একটি জাতির উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগে শিক্ষায় সর্বোচ্চ ভর্তুকি দেওয়া। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত শিক্ষায় কিছু ভর্তুকি দেওয়া হলেও তা দেশের বাস্তব চাহিদার তুলনায় খুবই অপ্রতুল।

শিক্ষায় প্রবেশাধিকার সংকট :
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) ২০২৪ সালের তথ্যমতে, প্রাথমিক সমাপনীর পর মাধ্যমিকে ভর্তি হওয়ার হার শহরে প্রায় ৯০%, অথচ গ্রামে তা ৬২% এরও কম। দরিদ্র পরিবারের বহু শিশু প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেই ঝরে পড়ে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্বাভাবিক কোর্স ফি’র চাপে উচ্চশিক্ষার পথে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গড় বার্ষিক খরচ প্রায় ১২,০০০ টাকা, কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে একই কোর্সের খরচ ১,২০,০০০ থেকে ৩,৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত। এর ফলে উচ্চশিক্ষায় সুযোগ প্রায় একচেটিয়াভাবে উচ্চবিত্তের হাতে চলে যাচ্ছে।

উচ্চশিক্ষায় বৈষম্য :
বিদেশে পড়াশোনার সুযোগও প্রায় পুরোপুরি উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা সামাজিক বৈষম্যকে আরও গভীর করছে।

কারিগরি শিক্ষার অভাব :
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখনও মূলত বইভিত্তিক জ্ঞানকেন্দ্রিক। অথচ চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় কারিগরি দক্ষতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। ভারত Skill India Mission-এর মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে বিদেশে রপ্তানি করছে। বিপরীতে, বাংলাদেশের প্রায় ৭০% প্রবাসী শ্রমিক অদক্ষ। ফলে তারা বিদেশে অধিকাংশ সময় লেবার হিসেবে কাজ করে, যেখানে ভারতের দক্ষ কর্মীরা ইঞ্জিনিয়ারিং, মোটর মেকানিক্স, টেকনিশিয়ানসহ উচ্চ আয়ের পেশায় যুক্ত হচ্ছে।

সমাধানের প্রস্তাব :
শিক্ষায় সর্বোচ্চ ভর্তুকি দিতে হবে, অর্থাৎ জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির অন্তত ৬% করতে হবে।
দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থীদের জন্য বই, খাতা, ইউনিফর্ম ও ডিজিটাল ডিভাইস বিনামূল্যে প্রদান করতে হবে। কারিগরি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন্তত একটি কারিগরি কোর্স চালু ও বাধ্যতামূলক করতে হবে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন সংখ্যা বৃদ্ধি করে অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থীকে কম খরচে উচ্চশিক্ষার সুযোগ দিতে হবে। উপজেলা পর্যায়ে স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার করে প্রযুক্তি, শিল্প ও সেবা খাতে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। নিম্ম ও মধ্যভিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষার জন্য সুদমুক্ত বা সহজলভ্য শিক্ষা ঋণের ব্যবস্হা করতে হবে।

উপসংহার :
শিক্ষা কোনো ব্যয় নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। শিক্ষায় বৈষম্য দূর না হলে একটি জাতি তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারবে না। বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষায় জোর দিয়ে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা গেলে শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাবে। দক্ষ জনশক্তিই হতে পারে টেকসই উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি।

মোঃ মঈনুল আলম ছোটন
আহ্বায়ক, শহীদ জিয়া স্মৃতি সংসদ,
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা।